বাবার পুরনো স্মৃতি( সম্পূর্ণ সত্য ঘটনা)


 পর্ব ১: চৈত্র সন্ধ্যার আড্ডা ও বাবার পুরনো স্মৃতি

আজকের এই হাড়হিম করা সত্য ঘটনাটি আমাদের পাঠিয়েছেন কিরণ আচার্য।ঘটনাটি তার নিজের বাবার জীবনে ঘটা এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। চলুন, সরাসরি চলে যাই সেই গল্পে।

সেদিন ছিল চৈত্রের এক সন্ধ্যা। সারাদিনের কাঠফাটা রোদের পর সন্ধ্যায় বেশ ঝোড়ো হাওয়া বইছিল। 

আমি, আমার ছোট বোন আর বাবা বাড়ির উঠোনে মাদুর পেতে বসে গল্প করছিলাম। সাথে চলছিল চা আর বিস্কুট পর্ব। এমন চমৎকার পরিবেশে ভূতের গল্প শোনার চেয়ে রোমাঞ্চকর আর কী হতে পারে!আমি বায়না ধরলাম, "বাবা, অনেকদিন তোমার মুখে ভূতের গল্প শুনি না। আজ একটা ভূতের গল্প বলতেই হবে!"

বাবা একটু হেসে বললেন, "এই সন্ধ্যায় ভূতের গল্প! রাতে তুই আর তোর ছোট বোন তো ভয়ে কাঁপবি।"

কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা। আমাদের প্রবল অনুরোধে বাবা শেষমেশ রাজি হলেন। একটু গম্ভীর হয়ে বাবা বলতে শুরু করলেন:

"ঠিক আছে, আজ তোদের এমন এক ঘটনার কথা বলব, যা আমার নিজের জীবনে ঘটেছিল। আমি জীবনে একবারই অশরীরীর পাল্লায় পড়েছিলাম। আর ঈশ্বরের কৃপায় সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে ফিরেছিলাম। সালটা ১৯৯৮। তোরা তখন জন্মাসনি। আমার বয়স তখন ছাব্বিশ কি সাতাশ। গ্রামের বাজারে নতুন একটা দোকান দিয়েছি। দোকানটা ছিল বাজারের নরসিংহ মন্দিরের খুব কাছাকাছি।"

এমন গল্প প্রতিদিন পেতে পেজটি এখনই Follow করুন।

বাবা বলে চললেন, "প্রতিদিন বেচাকেনা সেরে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টা বেজে যেত। তবে কাজের চাপ বা বেচাকেনা বেশি থাকলে ফিরতে রাত ১০টা-১১টাও বেজে যেত কখনো কখনো। সেবার দোকান দেওয়ার প্রায় বছর দুয়েক কেটে গেছে। বাজারে আমার বেশ জানাশোনা আর ব্যবসাও বাড়তে শুরু করেছে। দিনকাল ভালোই যাচ্ছিল। কিন্তু সেই শনিবারের রাতের কথা আমি জীবনেও ভুলব না।"

পর্ব ২: নির্জন রাস্তা ও সাদা শাড়ির ছায়া

"কাজের ভীষণ চাপে সেদিন দোকান বন্ধ করতে রাত প্রায় ১১টা বেজে গেল। আমি তাড়াহুড়ো করে দোকান বন্ধ করে বাড়ির পথ ধরলাম। আমার এক হাতে একটা ব্যাগ আর অন্য হাতে একটা ভারী লোহার টর্চলাইট। 

মন্দিরটা পার হয়ে বাজারের মাঝবরাবর পৌঁছালাম। তখনকার দিনে বাজারের অবস্থা আজকের মতো এত উন্নত ছিল না।

রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, দুপাশের প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ। মানুষজনের আনাগোনা বলতে গেলে নেই-ই। আমি নিজের খেয়ালেই হাঁটছিলাম।

বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর খেয়াল করলাম, চারপাশটা বড্ড বেশি নিস্তব্ধ। এতক্ষণ তাও দু-একজন মানুষের দেখা মিলছিল, কিন্তু এখন এই রাস্তায় জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই।

 রাস্তার দুপাশ থেকে শুধু একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে খুব কাছ থেকে শিয়ালের ডাক।

হঠাৎ করেই মনের ভেতর একটা অজানা ভয় কাজ করতে শুরু করল। মনে হলো, শরীরটা যেন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। অন্যদিন তো এমন মনে হয় না! হঠাৎ আমার স্পষ্ট মনে হলো, কেউ যেন আমার পেছন পেছন আসছে। আমি তার হাঁটার শব্দও পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম।

আর কিছু না ভেবেই আমি পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম, আমার থেকে একটু দূরে সাদা শাড়ি পরা এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথায় বড় করে ঘোমটা দেওয়া। এত রাতে এই নির্জন রাস্তায় এক বৃদ্ধাকে দেখে আমি বেশ অবাক হলাম। 

ভাবলাম, কাছে গিয়েই জিজ্ঞেস করি। কিন্তু কয়েক পা এগোতেই খেয়াল করলাম, বৃদ্ধা আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আছে। আর তার সেই চাউনি... সেটা কোনো সাধারণ মানুষের চাউনি ছিল না!

তাকানো মাত্রই আমার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। ভেতর থেকে কেউ যেন আমাকে বারবার বারণ করতে লাগল ওই বৃদ্ধার কাছে যেতে। 

আমি আর এগোলাম না, সোজা ঘুরে বাড়ির রাস্তায় জোরে হাঁটতে শুরু করলাম।

কিছুদূর যাওয়ার পর অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, পেছন থেকে আর হাঁটার শব্দ আসছে না। আমি একটু ভয় নিয়েই পেছন ফিরে তাকালাম। কিন্তু একী! রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা! বৃদ্ধা গেল কোথায়? রাস্তার দুপাশে শুধু ধুধু ধানক্ষেত, কোনো গলিপথও নেই যে সে অন্যদিকে চলে যাবে। আমি হাতের টর্চ জ্বেলে ধানক্ষেতের এদিক-ওদিক খুঁজলাম। কোথাও কেউ নেই!

এইবার আমি সত্যিই ঘাবড়ে গেলাম। ঠিক করলাম, যেভাবেই হোক দৌড়ে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। আমি খুব দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু রাস্তা যেন আর শেষই হয় না!

 হঠাৎ টর্চের আলোটা সামনের দিকে পড়তেই আমি শিউরে উঠলাম। ওই তো! যেই বৃদ্ধা এতক্ষণ আমার পেছনে ছিল, সে এখন আমার সামনে হাঁটছে!

কিছুক্ষণ আমার সামনে হাঁটার পর চোখের পলকে বৃদ্ধা বাতাসে মিলিয়ে গেল। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, ইনি কোনো সাধারণ বৃদ্ধা নন। গ্রামের অনেকের মুখে শোনা সেই সাদা শাড়ি পরা অশরীরী পেত্নীর পাল্লায় পড়েছি আজ!"

পর্ব ৩: তালগাছের পেত্নী ও লোহার টর্চ

"বৃদ্ধা অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর আমি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াইনি, সোজা দৌড় লাগানোর প্রস্তুতি নিলাম। আমাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় কয়েকটা বড় বড় তালগাছ ছিল। তালগাছগুলোর কাছাকাছি আসতেই যা দেখলাম, তাতে আমার রক্ত জল হয়ে গেল।

আমি দেখলাম, সামনের দুটো তালগাছের মাথা একসাথে নিচের দিকে নুয়ে পড়েছে, আর তার ওপর বসে আছে সেই বৃদ্ধা! তার মাথার সাদা চুলগুলো জ্যান্ত সাপের মতো কিলবিল করে নড়ছে। আর সে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

এই দৃশ্য দেখে আমার পেট মোচড় দিয়ে উঠল। ভয়ে হাত-পা থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমি ঠিক করলাম, জীবনের সবচেয়ে জোরে দৌড়টা আমাকে আজই দিতে হবে। কিন্তু দৌড়াবো কী! আমার মনে হলো কেউ যেন অদৃশ্য শেকল দিয়ে আমার পা দুটো মাটির সাথে বেঁধে দিয়েছে। পা তোলার বিন্দুমাত্র শক্তি আমার শরীরে নেই।

দৌড়াতে না পেরে আমি মনে মনে ঈশ্বরকে ডাকতে চাইলাম, মুখে 'রাম' নাম নিতে চাইলাম। কিন্তু চরম ভয়ে গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হলো না। আমি মনে মনেই জপতে লাগলাম— 'রাম, রাম, রাম...'।

হঠাৎ এক খড়খড়ে বিকট গলায় পেত্নীটা বলে উঠল, 'অ্যাই ছোকরা! ওই পোড়া নাম তুই আর মুখে আনবি না। বাঁচার জন্য অনেকেই এই নাম নিয়েছে, কোনো লাভ হয়নি। তোরও আজ কোনো লাভ হবে না। হাতের ওই আলোটা (টর্চ) ফেলে দে, নইলে তোর ঘাড় আমি এক্ষুনি মটকাবো!'

ওর কথা শুনে আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম। আমার হাতে ওই ভারী লোহার টর্চলাইটটা আছে বলেই ও এতক্ষণ আমার শরীরের দখল নিতে পারেনি, আমার কোনো ক্ষতিও করতে পারেনি। আমি বুঝলাম, যাই হয়ে যাক, এই টর্চ হাত থেকে ফেলা যাবে না।

এই ভেবে আমি বুকে একটু সাহস সঞ্চয় করে এবার জোরে জোরে 'রাম' নাম জপতে শুরু করলাম। 'রাম, রাম, রাম...'পেত্নীটা এবার রেগে গিয়ে বলল, 'এই সামান্য রাম নামে তুই আমার কিচ্ছু করতে পারবি না। তোর ঘাড় আমি আজ মটকাবোই!'

ওর ধমকে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো। ভয়ে আমি প্রায় কেঁদেই ফেললাম। হঠাৎ দেখলাম, গাছ থেকে পেত্নীটা গায়েব হয়ে গেছে! ভাবলাম, এই সুযোগে দৌড় দিই। কিন্তু পা বাড়াতেই দেখলাম, সে আবার ঠিক আমার সামনে মাটিতে দাঁড়িয়ে!

এবার সে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় আমাকে গালিগালাজ করে বলল, 'তোর কপাল আজ খুব ভালো। নইলে তোকে আজ আমি জ্যান্ত ছাড়তাম না!' এই কথা বলেই সে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল।

সে কেন আমাকে ছেড়ে দিল, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। তবে ৫-১০ সেকেন্ড পরেই কারণটা পরিষ্কার হলো। আমার পেছন থেকে একটা পুরনো সাইকেল চালিয়ে আসার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনতে পেলাম। বুঝলাম, কেউ একজন আমার দিকেই আসছে। তাকে আসতে দেখেই অশরীরীটা পালিয়েছে।

সাইকেলটা কাছে আসতেই টর্চের আলোয় দেখলাম, আমাদের বাড়ির পাশের নিতাই কাকু। তিনি পেশায় গ্রামের ডাক্তার। হয়তো কোনো রোগীর বাড়ি থেকে এত রাতে ফিরছিলেন।নিতাই কাকু আমাকে দেখে অবাক হয়ে বললেন, 'কিরে! তুই এত রাতে এখানে একা দাঁড়িয়ে কী করছিস?'

আমি কোনো কথার উত্তর দিতে পারলাম না, হাউমাউ করে কেঁদে ফেললাম। শুধু টর্চের আলো ফেলে তালগাছের মাথাটার দিকে ইশারা করলাম।নিতাই কাকু এই গ্রামের পুরনো মানুষ, তিনি সব বুঝতে পারলেন। শুধু বললেন, 'অ্যাঁ... বুঝেছি। আর দেরি করিস না, ওঠ সাইকেলের পেছনে। আমি তোকে বাড়ি দিয়ে আসছি।'

আমি এক মুহূর্ত দেরি না করে সাইকেলে উঠে পড়লাম আর অবশেষে নিজের বাড়িতে এসে পৌঁছালাম।"গল্পটা শেষ করে বাবা থামলেন। কিন্তু বাবার মুখে এই হাড়হিম করা ঘটনা শোনার পর আমি আর আমার বোন এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে, সে রাতে আর আমাদের চোখের পাতা এক হয়নি।

সমাপ্ত 

এমন ঘটনা প্রতিদিন পেতে এখনই পেজটি Follow করুন।

গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগলো? আপনার কি মনে হয়, সে রাতে নিতাই ডাক্তার ঠিক সময়ে না এলে লোকটির পরিণতি কী হতো?

Farhan

নবীনতর পূর্বতন